কাগজে-কলমে হাকালুকি হাওরে বিলের সংখ্যা ২৩৮। তবে বাস্তবে এসব বিলের অনেকগুলোর অস্তিত্বই নেই। পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে গেছে একাধিক বিল। যেগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোরও অনেকটিতে কমছে পানির গভীরতা। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কয়েক বছর আগের তুলনায় কোনো কোনো বিলে পানির গভীরতা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাকালুকি হাওরের এমন চিত্র উঠে এসেছে স্থানীয় বাসিন্দা, মৎস্যজীবী, পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা, কুলাউড়া ও জুড়ী এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওর। জুড়ী, ফানাই ও সুনাইসহ প্রায় ১০টি নদী এবং অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া হাওরের সঙ্গে যুক্ত। এসব নদী ও ছড়া দিয়ে আসা পলি-বালু এবং বর্জ্য হাওরের বিভিন্ন বিল ও জলাধারে জমছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সময়ের সঙ্গে পলি-বালু জমে শতাধিক বিল ভরাট হয়ে গেছে। কাগজে ২৩৮টি বিল থাকলেও বাস্তবে প্রায় অর্ধেক বিলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। অবশিষ্ট বিলগুলোও ধীরে ধীরে ভরাট হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগে কোনো কোনো বিলে ৩০ থেকে ৩৫ ফুট পর্যন্ত পানির গভীরতা থাকলেও এখন তা ১৫ থেকে ২০ ফুটে নেমে এসেছে। দ্রুত খনন না করা হলে আগামী এক দশকে অবশিষ্ট বিলগুলোর অনেকটিও ভরাট হয়ে যেতে পারে।
হাওরটির আয়তন কাগজে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে কতটুকু হাওর টিকে আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরের বিভিন্ন অংশ দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণের কারণে কোথাও কোথাও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হাওরপারের বাসিন্দা রায়হান আহমেদ বলেন, জুড়ী উপজেলা বাজারে বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলেন। এসব বর্জ্য জুড়ী নদী দিয়ে সরাসরি হাওরে গিয়ে পড়ে। হাওরের সঙ্গে যুক্ত অন্য নদী ও ছড়া দিয়েও বর্জ্য প্রবেশ করছে।
মৎস্যজীবী ফয়েজ মিয়া বলেন, আগের তুলনায় হাওরে মাছ কমে গেছে। পানির নিচে হাত দিলে অনেক সময় প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য পাওয়া যায়। আগে কোনো কোনো এলাকায় ১৫ থেকে ২০ ফুট পানির গভীরতা পাওয়া গেলেও এখন সেখানে ৫ থেকে ৭ ফুট পানিও পাওয়া যায় না।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, কয়েকটি কারণে হাকালুকি হাওরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বদলে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উজান থেকে আসা বালু-পলি হাওরের তলদেশ উঁচু করছে। এর সঙ্গে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যও যুক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, হাকালুকি হাওর বর্তমানে নানা সংকটে রয়েছে। বিলগুলো জরুরি ভিত্তিতে খনন, দখল হওয়া জায়গা চিহ্নিত করে উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। পাশাপাশি জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং হাওরে প্রবেশের মুখের নদী ও ছড়া খনন প্রয়োজন। বর্তমানে বাস্তবে কতগুলো বিল টিকে আছে, তার সঠিক হিসাবও করা দরকার।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, হাকালুকি হাওরে বর্জ্য যাওয়ার বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানানো হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে জনবল সংকটের কারণে সব এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন করা সম্ভব হয় না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন বলেন, হাকালুকি হাওরের ৬০ শতাংশ বিল ইজারা দেওয়া হলেও বাকি বিলগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় ইজারা দেওয়া যাচ্ছে না। কাগজে ২৩৮টি বিল থাকলেও বাস্তবে অনেক বিল ভরাট হয়ে গেছে। বিল ভরাটের কারণে হাওরে পানি ধরে রাখার সক্ষমতা কমছে। গত বছর যে পরিমাণ মাছ পাওয়া গেছে, চলতি বছরও তা পাওয়া যাবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
হাকালুকি হাওরের পানি, মাছ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাই বিলের প্রকৃত সংখ্যা ও আয়তন নির্ধারণ, ভরাট হওয়া বিল পুনঃখনন, দখল উচ্ছেদ এবং নদী-ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন পরিবেশকর্মীরা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্য আরও সংকটে পড়বে।
জি বাংলা ডেস্ক